জীবনের শুরুটাই ছিল অস্থিরতার ভেতর দিয়ে। ছোটবেলাতেই মা-বাবার বিচ্ছেদ। এরপর বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে দূরে বড় হওয়া ওয়ালিদ হাসান (১৭) শৈশব থেকেই বেড়ে উঠেছে তার মামার তত্ত্বাবধানে। বর্তমানে তার মামা প্রবাসে অবস্থান করলেও তিনিই দীর্ঘদিন ধরে ওয়ালিদের পড়াশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন করে আসছিলেন। দূর থেকে গড়ে ওঠা সেই দায়িত্বশীল ভালোবাসার ভেতরেই লালিত হয়েছিল ওয়ালিদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল এক করুণ ও রহস্যঘেরা ঘটনার মধ্য দিয়ে।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চাঁন্দেরকান্দি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে তিনদিন নিখোঁজ থাকার পর শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাতে ওয়ালিদ হাসানের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সদ্য শেষ হওয়া এসএসসি পরীক্ষার পর ফলাফলের অপেক্ষায় থাকা এই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত ওয়ালিদ হাসান রায়পুরা আর.কে.আর.এম উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং বাহেরচর গ্রামের আব্দুল হাইয়ের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিনদিন ধরে ওয়ালিদ নিখোঁজ ছিল। পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। সময় যত গড়িয়েছে, ততই বাড়তে থাকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। অবশেষে শনিবার রাতে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে, যা পুরো পরিবার ও এলাকাবাসীর জন্য হয়ে ওঠে এক হৃদয়বিদারক মুহূর্ত।
অভিযোগ রয়েছে, বাহেরচর মধ্যপাড়া গ্রামের একটি বসতঘরে ওয়ালিদকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হতে পারে। এরপর তার মরদেহ গোপন করার চেষ্টা চলছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। বিষয়টি টের পেয়ে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
প্রাথমিক সুরতহালে নিহতের গলায় কালো দাগের চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, তাকে ইলেকট্রিক তার বা অনুরূপ কিছু দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একই এলাকার এক কিশোরীর সঙ্গে ওয়ালিদের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
এ ঘটনায় ওই কিশোরীর মা ও মেয়েসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত পরিবারের কর্তা জাকির মিয়া পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, “ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে চারজনকে আটক করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
রবিবার সকালে ওয়ালিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। যে ছেলেটি কিছুদিন আগেও পরীক্ষার পর ফলাফলের অপেক্ষায় ছিল, আজ সে ফিরে এসেছে নিথর দেহ হয়ে। মামার অনুপস্থিতিতে দূর থেকে যিনি তার দায়িত্ব পালন করতেন, সেই পরিবার এখন শোকে স্তব্ধ।
এখন পুরো এলাকায় একটাই প্রশ্ন- এ কি শুধুই প্রেমঘটিত সম্পর্কের করুণ পরিণতি, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও কোনো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র? সেই উত্তর খুঁজছে পুলিশ। কিন্তু তদন্ত চললেও থেমে গেছে এক কিশোরের জীবন, আর ভেঙে পড়েছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।