দুপুরের রোদ তখনও তেমন তেজি হয়নি। বাড়ির পাশের খালটিতে প্রতিদিনের মতোই নেমেছিল কয়েকটি শিশু। কারও হাতে ছিল পানির ছিটা, কারও মুখে ছিল নির্মল হাসি। সেই হাসির শব্দে মুখর হয়ে উঠেছিল বড়কান্দা গ্রামের চারপাশ। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আনন্দের সেই মুহুর্তটা পরিণত হয় বুকফাটা কান্নায়। যে খালে শিশুদের হাসির ঢেউ উঠেছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই খাল থেকেই একে একে উদ্ধার করা হয় চারটি নিষ্পাপ শিশুর নিথর দেহ।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চাঁন্দেরকান্দি ইউনিয়নের বড়কান্দা গ্রামে ঘটে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। একই ঘটনায় আরও দুই শিশু গুরুতর আহত হয়েছে।
নিহতরা হলো- শামীম মিয়ার মেয়ে তাবিয়া (১৩), রুবেল মিয়ার দুই মেয়ে আয়েশা (৯) ও জান্নাত (৮) এবং বাদল মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া (১০)।
তারা সবাই বড়কান্দা এলাকার গাউসিয়া নুরে মদিনা মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী| কয়েক ঘণ্টা আগেও যারা বই-খাতা আর স্বপ্ন নিয়ে জীবনকে রঙিন করে তুলছিল, বিকেলের আগেই তারা সবাই চলে গেল না ফেরার দেশে।
স্থানীয়রা জানান, দুপুরে বাড়ির পাশের খালের পানিতে একসঙ্গে গোসল করতে নামে ছয় শিশু। খেলতে খেলতে তাদরে একজন গভীর পানিতে চলে যায়। এসময় অন্যরা তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে অসাবধানতায় একে একে সবাই পানির নিচে তলিয়ে যায়। আশপাশে থাকা কেউ প্রথমে বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেননি।
বেশ কিছু সময় পর পানিতে একটি শিশুকে ভাসতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়| মুহূর্তেই শুরু হয় প্রাণপণ উদ্ধার অভিযান। গ্রামের মানুষ ছুটে আসে খালের পাড়ে। কেউ পানিতে ঝাঁপ দেন, কেউ বাঁশ নিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একে একে উদ্ধার করা হয় শিশুদের।
তিনজনকে দ্রুত রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাবিয়া, আয়েশা ও জান্নাতকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সুমাইয়া ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আহত দুই শিশুর চিকিৎসা চলছে।
রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আশরাফুর রহমান জানান, বেলা ১টার দিকে তিন শিশুকে মৃত অবস্থায় তাদের হাসপাতালে আনা হয়। তখন তাদের কারও শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদস্পন্দন পাওয়া যায়নি। অপর এক শিশুর মরদেহ তার বাড়িতে রয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
দুর্ঘটনার পর বড়কান্দা গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। তাদের বাড়িতে একসঙ্গে শুরু হয় আহাজারি। কোনো মা বারবার মেয়ের নাম ধরে ডাকছেন, কেউ অচেতন হয়ে পড়ছেন, আবার কোনো বাবা নিথর চোখে তাকিয়ে আছেন সন্তানের নিস্তেজ মুখের দিকে। এমন দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি প্রতিবেশীরাও।
সবচেয়ে বেশি হৃদয় ভেঙেছে রুবেল মিয়ার পরিবারে। একই দিনে তিনি হারিয়েছেন তার দুই আদরের মেয়ে আয়েশা ও জান্নাতকে। সকালে যারা একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, বিকেলে তাদের ফিরতে হয়েছে সাদা কাপড়ে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে। এমন নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।
গাউসিয়া নুরে মদিনা মহিলা মাদ্রাসাতেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে বেঞ্চগুলোতে প্রতিদিন চার শিশুর কোলাহল শোনা যেত, সেগুলো এখন শূন্য হয়ে থাকবে। সহপাঠীরা নির্বাক, শিক্ষকরাও বাকরুদ্ধ।
রায়পুরা থানার ওসি মো. মজিবুর রহমান বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় ৪ শিশুর মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আরও দুই শিশুকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক বিকেলে চারটি কোমল প্রাণের এমন বিদায় শুধু চারটি পরিবারকেই নিঃস্ব করেনি; শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো বড়কান্দা গ্রাম। যে খালের পানি কিছুক্ষণ আগেও ছিল শিশুদের হাসির সাক্ষী, সেই খালই আজ হয়ে রইল চারটি পরিবারের আজীবনের কান্নার স্মৃতি। গ্রামের মানুষের একটাই প্রশ্ন- এতগুলো ছোট্ট প্রাণ কি এভাবেই হারিয়ে যেতে হতো?
https://shorturl.fm/q7KQ6
https://shorturl.fm/yXquL
https://shorturl.fm/3XdSR
https://shorturl.fm/xKEr0